🌊একটি মৎস্যকন্যা ও একটি ছেলের গল্পো🌊
নীল সাগরের মৎস্যকন্যাসমুদ্রের ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম ছিল। গ্রামের নাম ছিল নীলতট। সেই গ্রামের মানুষদের জীবন সমুদ্রকে ঘিরেই চলত—মাছ ধরা, নৌকা বানানো আর ঢেউয়ের শব্দ শুনে দিন কাটানো।
সেই গ্রামেই থাকত এক কিশোর, তার নাম অয়ন। অয়ন অন্য ছেলেদের মতো ছিল না। মাছ ধরার চেয়ে সে বেশি ভালোবাসত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে। তার মনে হতো, সমুদ্র যেন কোনো রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে একা সমুদ্রতীরে বসে সূর্যাস্ত দেখত। ঢেউগুলো যখন তীরে এসে ভাঙত, তখন তার মনে হতো কেউ যেন তাকে ডাকছে।
দুজনের দেখা
একদিন পূর্ণিমার রাতে অয়ন আগের মতোই সমুদ্রের ধারে বসেছিল। হঠাৎ সে দেখতে পেল জলের ভেতর থেকে অদ্ভুত নীল আলো বের হচ্ছে। কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে গেল পানির কাছে।
ঢেউয়ের মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে উঠে এলো এক মেয়ে।
তার লম্বা রূপালি চুল, চোখ দুটি সমুদ্রের মতো গভীর, আর কোমরের নিচে ঝলমলে মাছের লেজ।
অয়ন ভয়ে পিছিয়ে গেল।
মেয়েটি মৃদু হেসে বলল,
— ভয় পেয়ো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।
অয়ন বিস্ময়ে বলল,
— তুমি… তুমি কে?
— আমি নীরা। আমি সমুদ্রের মৎস্যকন্যা।
অয়ন বিশ্বাস করতে পারছিল না। গল্পে শোনা মৎস্যকন্যা সত্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে!
বন্ধুত্বের শুরুসেই রাত থেকেই অয়ন আর নীরার বন্ধুত্ব শুরু হলো। প্রতিদিন রাতে নীরা জলের ওপর ভেসে উঠত আর তারা গল্প করত।
নীরা তাকে সমুদ্রের নিচের জগতের গল্প শোনাত—
রঙিন প্রবাল, আলো ছড়ানো মাছ, ডুবে যাওয়া জাহাজ আর হারিয়ে যাওয়া রাজ্য।
অয়ন বলত মানুষের পৃথিবীর কথা—
স্কুল, বৃষ্টি, উৎসব, আর গ্রামের মানুষের হাসি।
ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব গভীর হয়ে উঠল।
একদিন নীরা বলল,
— জানো, আমাদের জগতে মানুষদের নিয়ে অনেক সতর্কতা আছে। বলা হয় মানুষ বিশ্বাসঘাতক।
অয়ন শান্তভাবে বলল,
— সবাই একরকম নয়।
নীরা তার দিকে তাকিয়ে বুঝল, এই ছেলেটি আলাদা।
বিপদের ছায়াকয়েক সপ্তাহ পর গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল—সমুদ্রে নাকি অদ্ভুত আলো দেখা যাচ্ছে। কিছু জেলে বলল তারা অদ্ভুত এক প্রাণী দেখেছে।
লোভী কিছু মানুষ সিদ্ধান্ত নিল সেই প্রাণীকে ধরবে। তারা ভাবল, যদি এটি সত্যিই মৎস্যকন্যা হয়, তবে সেটি বিক্রি করে অনেক টাকা পাওয়া যাবে।
অয়ন এই কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।
সেই রাতে সে দৌড়ে সমুদ্রতীরে গেল।
ত্যাগ
— নীরা! বিপদ! মানুষ তোমাকে ধরতে আসবে!
নীরার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— আমি জানতাম একদিন এমন হবে…
ত্যাগের সিদ্ধান্তরপরের রাতেই জেলেরা জাল নিয়ে সমুদ্রে নামল। নীরা যখন অয়নের সঙ্গে দেখা করতে উঠেছিল, তখন হঠাৎ চারদিক থেকে জাল ছুঁড়ে দেওয়া হলো।
নীরা আটকা পড়ল।
অয়ন চিৎকার করে উঠল,
— না! তাকে ছেড়ে দাও!
কেউ তার কথা শুনল না।
হঠাৎ অয়ন পানিতে ঝাঁপ দিল। সে জালের দড়ি কাটতে লাগল ধারালো পাথর দিয়ে। ঢেউ উত্তাল হয়ে উঠল।
নীরা বলল,
— অয়ন, চলে যাও! তুমি ডুবে যাবে!
অয়ন বলল,
— তোমাকে রেখে আমি যাব না।
অবশেষে জাল ছিঁড়ে গেল। নীরা মুক্ত হলো।
ঠিক তখনই এক বিশাল ঢেউ এসে নৌকাগুলো উল্টে দিল। সুযোগ পেয়ে নীরা অয়নকে গভীর জলে টেনে নিল।
সমুদ্রের নিচেঅয়ন অনুভব করল সে ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে সে শ্বাস নিতে পারছে!
নীরা বলল,
— আমি তোমাকে সমুদ্রের আশীর্বাদ দিয়েছি। কিছু সময় তুমি এখানে বাঁচতে পারবে।
অয়ন প্রথমবার সমুদ্রের নিচের পৃথিবী দেখল—
ঝলমলে আলো, নাচতে থাকা মাছ, প্রবালের প্রাসাদ।
কিন্তু নীরার চোখে আনন্দ ছিল না।
— তুমি আর এখানে থাকতে পারবে না। মানুষের পৃথিবীই তোমার জায়গা।
অয়ন ধীরে বলল,
— আর তুমি?
নীরা মৃদু হাসল,
— আমি সমুদ্রের সন্তান।
বিদায়ভোরের আগে নীরা অয়নকে তীরে ফিরিয়ে আনল।
সূর্যের আলো উঠছিল।
নীরা বলল,
— আজ আমাদের শেষ দেখা।
অয়নের চোখ ভিজে উঠল।
— আমরা কি আর কখনো দেখা করব না?
নীরা উত্তর দিল না। শুধু তার হাতে একটি নীল শাঁস তুলে দিল।
— যখনই সমুদ্রের শব্দ শুনবে, মনে করবে আমি আছি।
তারপর সে ধীরে ধীরে ঢেউয়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
বহুবছরপর
বহু বছর কেটে গেল।
অয়ন বড় হলো, সমুদ্র গবেষক হলো। কিন্তু সে কখনো নীল শাঁসটি হারায়নি।
প্রতিবার সমুদ্রের ধারে দাঁড়ালে তার মনে হতো ঢেউয়ের মাঝে কেউ হাসছে।
এক পূর্ণিমার রাতে, বহু বছর পর, সে আবার সেই নীল আলো দেখল।
দূরে জলের ওপর এক পরিচিত ছায়া।
অয়ন হাসল।
সমুদ্র কখনো সত্যিকারের বন্ধুত্ব ভুলে যায় না।
ঢেউ এসে তার পায়ে ছুঁয়ে গেল—
যেন নীরা এখনও তাকে মনে রেখেছে।
সমাপ্ত। 🌊✨
