Cherreads

দুই বন্ধুকে নিয়ে পান দোকানীর রহস্যময় ঘটনা

Rakhi_Deb
7
chs / week
The average realized release rate over the past 30 days is 7 chs / week.
--
NOT RATINGS
174
Views
VIEW MORE

Chapter 1 - Ch 1 এই গল্পটিতে একটি নেশাসক্ত কিশোরের মনের জগতের কাহিনী চিত্রিত হয়েছে।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। এক দুদিন করে সে আজ বেশ কদিনই। আজ প্রশান্তের বেগ থেকে টাকা চুরি গেল। প্রশান্ত নালিশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ক্লাস টিচার মহেন্দ্র মাস্টার তো রেগে একেবারে আগুন। আর হবেনই তো। মাত্র দুদিন আগেই তো তিনি সকলকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। তাই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি ভীষণ গর্জে উঠলেন।

' তোদের পই পই করে বলেছিলাম , স্কুলে আসার সময় বেশি টাকা নিয়ে আসবি না। দরকার না-থাকলে একদম আনবি না।'

' স্যার দুটো খাতা কেনার ছিল।' প্রশান্ত সাফাই দেবার চেষ্টা করে। তার কথায় ভ্রুক্ষেপ না - করেই তিনি বলে গেলেন.....

' তোদের আমি বলেছিলাম যে চোর যদি ধরা পড়ে , তবে এই স্কুল ছেড়ে তাকে পালাতে হবে। এ স্কুলে চোরের কোন স্থান নেই।'

এবার তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে অগ্রসর হলেন। এবং একধার থেকে একে একে সকলের স্কুল ব্যাগ ও পকেট চেক করা শুরু করলেন। সিদ্ধার্থের ব্যাগ খুলেই মহেন্দ্র মাস্টার তার মুখের দিকে খর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ব্যাগে দুখানা ৫০ টাকার নোট ও আরোও কিছু নোট। প্রশান্তেরও দুটি ৫০ টাকার নোট হারিয়েছে।

' এ আমার নিজের টাকা। মা আমাকে দিয়েছেন।'

'ফাঁকি মারছিস ?' মহেন্দ্র মাস্টার গর্জে ওঠেন।

'সংসারে কি ৫০ টাকার নোট শুধু দুখানাই ' , চোখে চোখ রেখে সিদ্ধার্থ প্রায় ফেটে পড়ল । রাগে তার শরীর রীতিমতো কাঁপছে।

সবাই হতবাক হয়েছে রইল। ওদের ক্লাসে কেউই আজ পর্যন্ত শিক্ষকের প্রতি এমন রূঢ় আচরণ করেনি। মহেন্দ্র মাস্টারের মতো কড়া শিক্ষকের চোখের দিকে তাকিয়ে এ ধরনের কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। গোটা ক্লাসে বিরাজ করছে নিঃশব্দতা। মাস্টারমশাই কোনোক্রমে নিজেকে সামলে অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন...

' ঠিক আছে। কিন্তু যেদিনই বামাল শুদ্ধ ধরা পড়িস, এই স্কুলে সেদিনই হবে তোর শেষ দিন এটা জেনে রাখিস।'

( 2 )

ইচ্ছে করেই নির্মল খানিকটা দেরি করে স্কুলের গেটের বাইরে বেরিয়ে এল। কি একটা কৌতুহল এবং সন্দেহের বশবর্তী হয়েই সে পান দোকানটির দিকে এগিয়ে গেল। অনুমান অনুযায়ী সে সিদ্ধার্থকে পানদোকানে পেয়ে গেল। নির্মল ওকে প্রায়ই এই পানের দোকানে দেখতে পায়। দু একদিন দোকানের আড়ালে লুকিয়ে সিদ্ধার্থর সিগারেট খাওয়াও নির্মল লক্ষ্য করেছে । প্রথমবার দেখে সে থতমত খেয়ে গেছিল। ওদের মত ছোট ছেলেপিলেকে সিগারেট খেতে নির্মল এর আগে কখনো দেখেনি।

এই দোকানদারকে নির্মলের কেন জানি মোটেই ভালো লাগে না। দোকানে যে- সব ছেলেমেয়েরা যায় তার মনে হতো দোকানদার যেন খুব মন দিয়ে ওদের নিরীক্ষণ করে। নির্মলকেও এভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। পরে একদিন তার কথা জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার মা, বাবা, বোনের সম্পর্কে জানতে চাওয়া কথাগুলোয় সে তিনমাত্রও আন্তরিকতার সন্ধান পায়নি। বরং অন্যের হাঁড়ির খবর জানার অতিরিক্ত আগ্রহ নির্মলের চোখে লোকটিকে কিছুটা বিচিত্র রহস্যময় করে তুলেছিল।

পারতপক্ষে সে আজকাল ওই দোকানে আর যায় না। এই দোকানদারের সঙ্গে সিদ্ধার্থেরই বা কি এমন কথা বলার আছে। সে -কথা অবশ্য নির্মল কস্মিনকালেও জানতে চাইনি। হয়তো সিদ্ধার্থের বেপরোয়া স্বভাবের জন্যেই , অন্যদের মতো নির্মলও

সিদ্ধার্থকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল।

কিন্তু সিদ্ধার্থ আগে কিন্তু অমনটা ছিল না। ও তাদের সঙ্গে হাসি খেলায় দিব্যি মজে থাকতো। আজ ক 'মাস ধরেই সে গম্ভীর খিটখিটে আর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বন্ধুদের কাছ থেকে পালিয়ে ক্লাসের পেছনের বেঞ্চিতে বসতে শুরু করেছে। শিক্ষকদের দেওয়া হোমটাস্ক প্রায়ই করছে না, এমনকি মাঝে মাঝে স্কুলও কামাই দিচ্ছিল। নির্মল এ-কান সে-কান করে সিদ্ধার্থের মা -বাবা সম্পর্কে বেশ কিছু কথা জানতে পেরেছে। ভেবেছে তার এই পরিবর্তন বোধকরি সে-সব কারণেই হয়েছে। হয়তো সে- সব কথা সত্যিও। কিন্তু এই রহস্যময় দোকানটিতে সিদ্ধার্থর সঘন উপস্থিতি নির্মলকে এক জটিল ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিল। এই ধাঁধা, আর এই রহস্যের সমাধান তার করা চাই। একটা রহস্যের গোলোকধাঁধায় একজন বন্ধুকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। কেবল পড়ালেখায় ভালো হলেই প্রকৃত সুখ পাওয়া যায় না।

নির্মল দোকানটির দিকে এগিয়ে গেল।

( 3 )

' কি চাই? ' দোকানদারের কণ্ঠস্বরে ফুটে ওঠা বিরক্তির ঝাঁঝ বুঝে নিতে নির্মলের অসুবিধে হয়নি।

' সিদ্ধার্থকে চাই।' নির্মল পরোয়াহীন উত্তর ছুঁড়ে দেয়। এবার সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে প্রায় কর্তৃত্বের সুরে বলে ওঠে...

'তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।'

হয়তো দায়িত্ববোধই কর্তৃত্ব প্রদান করে। সেই কর্তৃত্বজাত নির্দেশের সুরে সিদ্ধার্থের মতো গুরু-গোঁসাই না- মানা ছেলেও দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্মলের পেছন পেছন সে পা ফেলে। দোকানের অদূরে নির্মল দাঁড়িয়ে। কোনরকম ভূমিকা না- করেই নির্মল তাকে প্রশ্ন করে।

' প্রশান্তের টাকা কেন চুরি করেছিলি ?'

'তোরা সবাই কেবল আমাকেই কেন সন্দেহ করছিস ?'সিদ্ধার্থ নিজেই টের পাচ্ছে তার কথায় কোথায় যেন জোর কমে গেছে। তাতে আত্মবিশ্বাসের চিহ্নমাত্র নেই। তবুও সে শেষবারের মতো একবার চেষ্টা করে দেখল...

'আমি চুরি করিনি।'

'আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল।'... নির্মলের কথায় তার অজান্তেই যেন কিছুটা কোমলতা মিশে গেল।

' তোর চোখের দিকে চাইতে না -পারার তেমন কি আছে ?' মাতা নাবিয়ে সিদ্ধার্থ বলে গেল।

কয়েকটি মুহূর্ত অস্বস্তিকর নীরবতায় পার হয়ে গেল। নির্মল লক্ষ্য করল মহেন্দ্র মাষ্টার এর চোখে চোখ রেখে ভেংচে ওঠা বেপরোয়া ছেলেটি যেন তার সম্মুখে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে।

'তোর কি হয়েছে আমাকে বলবি ?'

না, সিদ্ধার্থ কিছুই বলেনি। সে কোনো কিছুই বলতে চাইনি। বলতে পারবেও না।। কি হলো কিজানি..... নির্মল কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিদ্ধার্থ সামনের চলন্ত সিটি বাসের পেছনে ছুটতে শুরু করল। একটা সময় সে ঝাপ দিয়ে বাসের পা-দানিতে ঝুলে পড়ল। নির্মলের গলা সে ঠিকই শুনতে পেল .....

'তোর কি হয়েছে আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ।'

( 4 )

সিদ্ধার্থ এক সপ্তাহ স্কুলে যায়নি। যেতে তার সাহস হয়নি। নির্মলের কথাগুলো তার যন্ত্রণাদগ্ধ বুকের মধ্যে সংগীতের মতো বেজে চলছে।

'তোর কি হয়েছে আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ !'

এই কথাগুলি যারা বলতে পারে সে-সব মানুষজন সিদ্ধার্থের জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। না -পাওয়া ভালোবাসার আশা যেন তাকে দুর্বল আর অভিমানী করে। কার ওপর এই অভিমান সিদ্ধার্থ যেন নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না।

মহেন্দ্র মাস্টারের কর্কশ কঠোর বাক্যবাণের মুখোমুখি হওয়া যেন সহজ..... তার মত বেপরোয়া দুরন্ত একটা ছেলের পক্ষে চোখে চোখ রেখে আক্রমণের প্রত্যুত্তর দেওয়া সহজ, কিন্তু নির্মলের মত ছেলের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়। ওর মত ছেলের কথার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়, বরং অস্বস্তিকর মৌনতায় শুধু ছটপটানোই সার।

নির্মলের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সিদ্ধার্থের খানিকটা মানসিক প্রস্তুতির দরকার।

নির্মলের সঙ্গে মুখোমুখি হবার ভয় নাকি নির্মলের কথাগুলি যে -প্রবল প্রতিরোধক সঞ্চার করেছে সে-জন্য তা ঠিক ও বুঝে উঠতে পারছে না। সে এক সপ্তাহ ওই পান দোকানে যেতে পারেনি। হয়তো এই জন্যেই পুরনো বিষাদের দহন বেড়েছে, বেড়াতে অস্থিরতাও ; কোন এক অনিশ্চয়তা ও ভীতির ভাব প্রবল আকার ধারণ করে যেন তাকে গ্রাস করার জন্য অহরহ তাড়া করেছে। সিদ্ধার্থ ভেবে দেখল ইদানিং তার হাত-পায়ের কাঁপুনি যেন বেড়ে উঠেছে।

পান -দোকানি নির্মল ও অন্য যে -সকল লোক তার আপন ছিল, সবাই আপন হয়ে থাকা উচিত ছিল। সেইসব মানুষের ভিন্নমুখি টানাপড়েন আর দুঃসহ স্মৃতির ভারে সে বিছানায় পড়ে ছটপট করছে। একা। ঘড়ের মৃত্যুশীতল নির্জনতায় সে ডুবে তাকে আজকাল। তার বুকের মধ্যে সঞ্চিত কয়টি শব্দ যেন চৌচির করে ফেলছে তার নিজের নিঃসঙ্গ নির্জন জগৎকে .....

'তোর কি হয়েছে আমাকে বলতেই হবে সিদ্ধার্থ।'

ক্লাসের ঢুকেই মহেন্দ্র মাস্টার ছাত্র-ছাত্রীদের মুখগুলোয় একবার চোখ বুলালেন নীরবে । তারপর একটা যেন তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি বললেন..... 'ওই বজ্জাতটা আজও স্কুলে আসেনি। চোর ধরা পড়ে এখন লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছে না।'

নির্মলের মনটা এ কথা শুনে যেন স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেল। কিছুই একটা বলতে গিয়েও সে থেমে গেল। মানুষের দেখা ঘৃণ্য সত্যের আড়ালেও হয়তো লুকিয়ে থাকে অন্য কোন করুণ সত্য। সেইহবই সে খুঁজে ফিরছে। খুঁজে সে বের করবেই।

‌ ( 5 )

কোঠাটির ভেতরে আঁজলা অন্ধকার। বিছানা ছেড়ে লাইট জ্বালাতে সিদ্ধার্থের ইচ্ছে হচ্ছিল না। মা বোধকরি এখনো ফেরেননি। আজ এতগুলো দিন সে স্কুলে যাচ্ছে না। তা নিয়ে মায়ের কোন মাথাব্যাথা নেই। একদিন শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, ' স্কুলে যাবি না ? ' সে শরীর ভালো নেই বলে কথায় ইতি টেনে দিয়েছিল। তার মা এতটাই আশ্বস্ত হয়েছিলেন যে তাকে আর দ্বিতীয় বারের জন্য জিজ্ঞেস করেননি। না, না, তার অভিমান হয়নি। যে- সকল আঘাত ও দুঃখ প্রাত্যহিক হয়ে পড়ে, তারা একসময় হয়তো মানুষকে অভিমানী করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে বই-কি।

বাবা তাদের ছেড়ে গেছেন বোধকরি দুবছর হল। বোঝার বয়স হবার পর থেকেই সে দেখে আসছিল মা ও বাবার মধ্যেকার দুর্বাদল বচসা। প্রচণ্ড চেল্লামেল্লি, উপচে পড়া তীক্ষ্ণ গালিগালাজের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে সে নির্বাক চেয়ে থাকত মা ও বাবার প্রস্তরকঠিন দুখানি মুখের দিকে। মা না বাবা, কার পক্ষ সে নেবে.... সেই নিদারুণ প্রশ্নের আঘাতে অবিরত রক্তক্ষরণ হতো তার কোমল হৃদয়ে। বিনিদ্র রাতগুলোয় কত কত না চোখের জল তার চোখে শুকিয়ে গেছে..... সেইসব চোখের জল মুচে দেবার মত মায়ের হাতের কোমল স্পর্শ যেন চিরকালের মতো কোথায় হারিয়ে গেল। বাবারও।

এবং একদিন বাবা তাদের দুজনকে এই ঘরে একলা ফেলে কোথায় যে চলে গেলেন।

মা-বাবার মধ্যে কি এমন এক প্রচণ্ড, আমোঘ অমীমাংসিত প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল, যে প্রশ্ন তাঁদের নিজের সন্তানকেও দুঃখ যন্ত্রণার অতল এবং পারাপারহীন সাগরে নিক্ষেপ করার হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি ?

এসেছিলেন। সপ্তাহ -পনেরো দিনের মাথায়। স্কুল ছুটির পর বাবা এসে তার সঙ্গে দেখা করতেন। নানা রকমের চকোলেট নিয়ে আসতেন বাবা। ঘরে ফিরে এসে যখন সে চকোলেট কামড় দিত, চকোলেটের স্বাদ তার জিভে লাগার আগে তার দুচোখ ভরে যেত জলে। অবাধ্য সেই অশ্রুদ্বারা নীরবে ঝরে পড়তো অঝোরে। মা-বাবার কি সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন, যা তার চোখের জলের চেয়েও বহুগুণে ভারী।

অল্প দিনের মধ্যেই বাবার দেওয়া চকোলেটের জমানো কাগজে ভরে গেছিল সিদ্ধার্থর একটা পেন্সিল বাক্স। তার চেয়েও দ্রুত ভরে গেছিল তার বুক..... অসহনীয় শূন্যতায়..... হাসতে না -পেরে, খেলতে না -পেরে, ঘুমোতে না -পেরে..... এতটাই গম্ভীর ছিল সেই শুন্যতার ভার দুঃখের দহন।

এবং একদিন সে বাবাকে বলেছিল..... 'তুমি আর আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো না।'

বাবার মুখের দিকে চেয়ে তাকাতে পারেনি, তার ভয় করছিল..... বাবার চোখের কোণায় জমাট বাঁধা জল যদি তাকেও অস্বস্তিতে ফেলে।

'কিন্তু কেন ?

বাবার প্রশ্নের উত্তর সে দেয়নি। বাবাকে সে কোনোদিন জিজ্ঞেসও করেনি..... কেন তাকে ছেড়ে তিনি চলে গেছেন !