নিশীথ রাতের হালকা ঠান্ডা বাতাস জানালার পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছিল। দূরে কোথাও মৃদু বৃষ্টির শব্দ, আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক—পুরো শহর যেন এক রহস্যময় আবরণে ঢেকে গেছে। ঠিক এমন এক রাতেই প্রথম দেখা হয়েছিল আরিয়ান আর মেহরার।
১. প্রথম দেখা
আরিয়ান একজন ফটোগ্রাফার। তার কাজই হলো অচেনা জায়গা ঘুরে বেড়িয়ে ছবি তোলা—মানুষের মুখ, রাস্তার গল্প, আর সময়ের ছাপ ধরে রাখা। সেদিনও সে বেরিয়েছিল পুরনো শহরের এক নির্জন গলিতে, যেখানে সময় যেন থমকে আছে।
হঠাৎ করেই সে দেখতে পেল—একটা পুরনো বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে। সাদা শাড়ি, খোলা চুল, আর চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা। মেয়েটি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন কিছু খুঁজছে।
আরিয়ান অজান্তেই ক্যামেরা তুলল। ক্লিক!
মেয়েটি ঘুরে তাকালো। চোখাচোখি হতেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো—যেন তারা আগে কোথাও দেখা করেছে।
"তুমি কে?" মেয়েটির কণ্ঠে ছিল বিস্ময় আর সতর্কতা।
"আমি... আমি আরিয়ান। ছবি তুলছিলাম। তোমাকে দেখে থেমে গেলাম।"
মেয়েটি একটু হেসে বলল, "সবাই থেমে যায়... কিন্তু সবাই থাকতে পারে না।"
এই কথাটা শুনে আরিয়ান অবাক হয়ে গেল। কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই বিদ্যুতের ঝলকানি—আর মেয়েটি নেই!
২. খোঁজ
পরদিন সকাল থেকেই আরিয়ান সেই বাড়ির খোঁজ শুরু করল। লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কেউ ঠিক করে কিছু বলতে পারল না।
এক বৃদ্ধ দোকানদার বললেন, "ওই বাড়িতে কেউ থাকে না বাবা। বহু বছর ধরে খালি পড়ে আছে।"
"কিন্তু আমি তো কাল একজনকে দেখেছি!"—আরিয়ান বলল।
বৃদ্ধটা একটু থেমে বলল, "অনেকেই বলে... মাঝে মাঝে একটা মেয়ে দেখা যায়। তবে সেটা সত্যি কিনা কে জানে!"
আরিয়ানের মনে কৌতূহল আরও বাড়ল। সে ঠিক করল আবার রাতে যাবে।
৩. দ্বিতীয় রাত
সেই রাতেও বৃষ্টি হচ্ছিল। যেন প্রকৃতি নিজেই একটা গল্প তৈরি করছে।
আরিয়ান আবার সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর—হঠাৎ করেই দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল—পুরো বাড়িটা অন্ধকার, কিন্তু কোথাও একটা মৃদু আলো জ্বলছে।
সে সেই আলোর দিকে এগোল।
"তুমি আবার এসেছো..." —মেয়েটির কণ্ঠ।
"হ্যাঁ। কারণ আমি জানতে চাই তুমি কে।"
মেয়েটি এবার সামনে এল। আগের চেয়েও সুন্দর লাগছিল তাকে।
"আমার নাম মেহরা।"
"তুমি এখানে থাকো?"
"থাকি... আবার থাকি না।"
এই রহস্যময় উত্তরে আরিয়ান একটু বিরক্ত হলো। "ধাঁধা না দিয়ে পরিষ্কার করে বলো।"
মেহরা একটু চুপ করে থাকল। তারপর বলল, "সব সত্যি জানলে তুমি হয়তো আর আসবে না।"
"আমি তবুও জানতে চাই।"
৪. অতীতের গল্প
মেহরা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—
"অনেক বছর আগে, এই বাড়িটা ছিল খুব আনন্দে ভরা। আমি আর আমার পরিবার এখানে থাকতাম। কিন্তু এক রাতে আগুন লাগে... সবাই মারা যায়। আমিও।"
আরিয়ানের শরীর শিউরে উঠল।
"তাহলে তুমি..."
"হ্যাঁ, আমি আর বেঁচে নেই। কিন্তু আমার কিছু অসমাপ্ত ইচ্ছে, কিছু অনুভূতি আমাকে এখানে আটকে রেখেছে।"
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, "আমি ভয় পাচ্ছি না।"
মেহরা অবাক হয়ে তাকাল। "তুমি অন্যদের মতো নও।"
"হয়তো কারণ আমি তোমাকে অনুভব করতে পারছি।"
৫. প্রেমের শুরু
দিন যেতে লাগল। আরিয়ান প্রায় প্রতিরাতেই আসত। তারা গল্প করত—জীবন, স্বপ্ন, ভালোবাসা নিয়ে।
মেহরা বলত, "আমি কখনো ভাবিনি মৃত্যুর পরও কেউ আমাকে এভাবে ভালোবাসবে।"
আরিয়ান হাসত, "ভালোবাসা তো শুধু জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না।"
ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি হলো। কিন্তু সেই সম্পর্কের মধ্যে ছিল এক ভয়—তারা কখনো একসাথে থাকতে পারবে না।
৬. বিপদ
একদিন এক তান্ত্রিক সেই বাড়িতে আসে। সে বুঝতে পারে এখানে একটা আত্মা আছে।
"এই আত্মাকে মুক্ত করতে হবে"—সে বলে।
কিন্তু তার পদ্ধতি ছিল ভয়ংকর। সে মেহরাকে জোর করে বিদায় দিতে চেয়েছিল।
মেহরা কষ্টে চিৎকার করছিল। আরিয়ান দৌড়ে এসে তাকে থামানোর চেষ্টা করল।
"ওকে কষ্ট দিও না!"—আরিয়ান চিৎকার করল।
তান্ত্রিক বলল, "তুমি বুঝতে পারছ না। এই আত্মা এখানে থাকলে বিপদ হবে।"
"না! সে কাউকে ক্ষতি করে না!"
৭. সিদ্ধান্ত
মেহরা তখন বলল, "আরিয়ান, আমাকে যেতে দাও।"
"না! আমি তোমাকে হারাতে চাই না!"
"কিন্তু এটাই ঠিক। আমি অনেকদিন ধরে আটকে আছি। তোমার ভালোবাসা আমাকে মুক্তি দিয়েছে।"
আরিয়ানের চোখে জল চলে এল।
"তাহলে আমি?"
মেহরা মৃদু হেসে বলল, "তুমি বাঁচবে। আমার স্মৃতি নিয়ে।"
৮. শেষ দেখা
তান্ত্রিক তার কাজ শুরু করল। চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ল।
মেহরা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।
"আমি তোমাকে ভালোবাসি"—সে বলল।
"আমিও"—আরিয়ান উত্তর দিল।
শেষ মুহূর্তে মেহরা বলল, "একদিন আবার দেখা হবে... অন্য কোনো জীবনে।"
৯. পরিণতি
কয়েক মাস পরে, আরিয়ান আবার সেই জায়গায় গেল। কিন্তু এবার সেখানে নতুন একটা বাড়ি তৈরি হচ্ছে।
সে ক্যামেরা বের করল। হঠাৎ করেই তার চোখে পড়ল—একটা ছোট মেয়ে, দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।
মেয়েটার চোখ... ঠিক মেহরার মতো।
সে মৃদু হেসে হাত নাড়ল।
আরিয়ানও হাসল।
হয়তো গল্পটা শেষ হয়নি—শুধু নতুন করে শুরু হয়েছে।
Thank you
