Cherreads

Chapter 6 - Unnamed

‎#পর্বসংখ্যা৭

‎#হ্রদয়ামিলন

‎#Shavakhan

‎মালা ঈশানীর প্লেটটা এনে রাখলো টেবিলে। সেখান থেকে ঈশানী একটা ব্রেড নিয়ে মুখে পুড়ে, আরেকটা টান দিতেই ঈশানীর চোখে পড়ল ছোট, চকচকে, গা ছমছমে একটা তেলাপোকা। যেন ভূতের গল্প থেকে ছুটে এসে প্লেটের মাঝখানে বসে আছে। মাত্র এক সেকেন্ড তারপর বিস্ফোরণ,

‎ -"আআআআহহহ..."

‎ ঈশানীর চিৎকারে পুরো বাড়ির দেওয়ালে ধাক্কা লেগে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। সে এক লাফে চেয়ার ফেলে দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার হাত থর থর করে কাঁপছে। মুখের রং তখনই কাগজের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

‎সানা ঠিক তখন মাথা তুলে তাকালো একবার। আবারো নিজের কাজে মন দিল। মুখে অদ্ভুত নিরীহ ভাব যেন এখানে যা হচ্ছে সে সম্পর্কে তার কোনো লেনাদেনা নাই। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো বিজয়ী হাসি। কাল এসপির সাথে মিলে এদের টাইট দেওয়ার জন্য এমন অনেক জিনিস কিনেছে। তার মাঝে এটা একটা। আর্টিফিশিয়াল হলেও একদম রিয়েলের মত। একটু আগে কিচেনে এটা রাখতেই গিয়েছিল। বসে বসে অপেক্ষা করছিল কখন ঈশানী দ্বিতীয় ব্রেডটা উঠাবে।

‎ঈশানি কাঁপতে কাঁপতে বলল,

‎ -"কে...? কে...? এটা রেখেছে? এটা!.. এটা কোথা থেকে এলো?"

‎ঈশানী আরজের দিকে তাকায় যেন একটু নিরাপত্তা চাইছে। আরজে নির্জীব ভাবে প্লেটের দিকে একবার তাকিয়ে, নিঃশব্দে প্লেটসহ ডাস্টবিনে ফেলে দে। তারপর মালার দিকে তাকায়,

‎ -"দেখে শুনে কাজ না করতে পারলে বলে দিবে, আমি অন্য কাউকে হায়ার করে নেব।"

‎মালা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন সে নিজের ভুল বুঝতে পারছে না। সে তো ভালো করেই সবকিছু দেখেছে তাহলে এটা আসলো কোথা থেকে,

‎ -"সরি স্যার,আমি তো সব..."

‎আর কথা আসছে না। সে আরজে কে ভীষণ ভয় পায়।মিসেস আয়েশা এগিয়ে আসেন। মালার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন,

‎ -"বাবা এটা তো কিচেনে আসার কথা না। সবকিছু তো একদম পরিষ্কার করে রাখা হয়।"

‎আরজে কিছু বলবে ওই মুহূর্তে তার ফোন বেজে ওঠে। আরজে ফোন বের করে দেখে ডিরেক্টর 'আকাশ বিল্লাহ' কল করেছে। আরজে চোখ তুলে চারদিকে তাকিয়ে একবার সানার দিকে দৃষ্টি ফেলে, এত কিছুর মাঝেও ভ্রুক্ষেপ হীন ভাবে যে এক মনে খেয়েই চলছে। এমন মনে হচ্ছে চারদিকে নিউক্লিয়ার বোম ব্লাস্ট হলেও তার কিছু যায় আসে না। এবার চোখ উঠিয়ে আদেশ ছুড়লো,

‎ -"জাস্ট ক্লিন ইট"

‎আরজে ফোন উঠানোর জন্য অন্যদিকে চলে যায়। মেঘা আর মালা মিনিটে সব ক্লিন করে চলে যায়। এবার সানা উঠে দাঁড়ায় ঈশানীর দিকে বাঁকা দৃষ্টি ফেলে। বেচারীর অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। সে জীবনে অ্যানাকন্ডার থেকেও বেশি তেলাপোকা কে ভয় পায়। সানা বিজয়ী ভাব নিয়ে হেঁটে গিয়ে শুধালো,

‎ -"বাহ আজকাল তেলাপোকা রো সাহস আছে বলতে হবে, স্বয়ং কালনাগিনীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চলে এসেছে।"

‎ঈশানীর এতক্ষণে হুশ আসে।সে তড়াক করে সানার দিকে তাকায়, যে ইতিমধ্যে বিজয়ী হাসি দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে,

‎ -"তবে কালনাগিনী....., বলতে হবে তেলাপোকার ক্ষমতা আছে! কেমন এক সেকেন্ডে তোর পা ঠিক করে দিল। একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন্ড হয়ে গিয়েছে"

‎ -"মানে কি বলতে চাইছিস?"

‎ঈশানীর মাথায় বিদ্যুতের মত খেলে গেল, সে ব্যথা পেয়েছে এটা সানা কিভাবে জানল? সে তো সানা কে কিছু বলেনি, আর না কেউ সানাকে বলবে। তাহলে কি? তড়িৎ গতিতে সে সানার দিকে তাকায়।চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‎ -"তাহলে ওটা তুই ছিলি যে আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল?"

‎সানা এইটারে অপেক্ষা করছিল। সে কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বাহবা দিল,

‎ -"আরে বাহ! আমি তো ভেবেছিলাম তোর টপ ফ্লোর একদম খালি। এখন তো দেখছি একটু ব্রেইন ও আছে।"

‎ঈশানী এবার নিশ্চিত হলো। মুহূর্তে তার শয়তানি মস্তিষ্কে খেলে গেল অন্য কথা। সে সানার দিকে তাকিয়ে ডেভিল মার্কা হাসি দিয়ে,

‎ -"যদি আমি আরজে কে বলে দেই?"

‎কিন্তু সে জানেই না সানা দমবার মেয়ে নয়। সে হাত উঠিয়ে হাত ভয় পাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,

‎ -"ওহ নো!.. আমি তো ভয় পেয়েই গিয়েছি"

‎ এবার সে এবার সে উচ্চ শব্দে হেসে ফেলল,

‎ -"আবে কালনাগিনী, তোকে বলতে হবে না আমি করে দেখাচ্ছি তো আবার।"

‎______________

‎মেইন ডোর ঠেলে রওনাক প্রবেশ করল। ডাইনিং স্পেসে সানা আর ঈশানীকে দেখে ভ্রু কুঁচকে এলো। মনে মনে ভাবল, 'এরা একসাথে থাকলে তো শুধু ঝগড়া হয়, আজ এত শান্ত কেন?'

‎ ঠিক সেই মুহূর্তে সানা সিড়ি বেয়ে নিচে আসতে থাকা আরজের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছুড়ল,

‎ -"মিস্টার জাওয়ান"

‎আরজে তার দিকে তাকাতেই, সানা দু পা ঈশানীর দিকে এগিয়ে, নিখুঁত হিসেবি ভঙ্গিতে ঈশানীকে দুই হাত দিয়ে জোড়ে দিল এক ধাক্কা।

‎ ব্যাস ঈশানী 'ধপাস' করে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। সে সতর্ক হওয়ার সময় পেলো না। ঈশানী মোটেও প্রস্তুত ছিল না এর জন্য। সে কল্পনাও করতে পারেনি সানা এমন কিছু করবে।

‎আরজে, রওনাক ও অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মিসেস আয়েশা, মালা আর মেঘা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সবার ভাবনার বাহিরের কাজটা সানা করে 'ডোন্ট কেয়ার' ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

‎তখনই সবার কানে আসলো ঈশানীর ব্যথাতুর শব্দ। সে যতটা না ব্যথা পেয়েছে, তার থেকে দ্বিগুণ যেন অপমানিত হয়েছে। রওনাক দ্রুত এগিয়ে এসে ঈশানীর পাশে হাটু গেড়ে বসলো। তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু স্পষ্ট,

‎ -"ঈশানী... তুমি ঠিক আছ?"

‎সেই প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে ছিল উদ্বেগের শিহরণ।

‎আরজে প্রথমে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপর হঠাৎই তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। সে সানার দিকে তাকালো। দৃষ্টি ধারালো আর কড়া,

‎ -"সানা, এটা কি করলে তুমি? "

‎সানা একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিল মনে মনে বলল,

‎'Mood Activate'

‎তারপর শাঁস ছাড়লো। চোখের পলকে তার চোখে মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠলো। সে হাত নাড়িয়ে,

‎ -"ওহ নো..…! আম সো সরি, আম রিয়েলি সো সরি, কালনাগিনী... আই মিন ঈশানী। হাত ফসকে লেগে গেছে। আমি সত্যি বলছি ফ্রম মাই হার্ট এন্ড সোল"

‎সানা চোখ তুলে আরজের দিকে তাকিয়ে,

‎ -"আরে আপনি! দাঁড়িয়ে আছেন কেন? হয়তো ওর হাত পা কিছু ভেঙ্গে গিয়েছে? এভাবে পড়ে থাকলে তো ওর ক্যারেক্টার আই মিন ক্যারিয়ার ড্যামেজ হয়ে যাবে। ওকে কোলে তোলে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে যান,আপনার তো অভ্যস আছেই। এক কাজ করুন, আপনি ওর কোলে উঠুন, আই মিন ও আপনাকে কোলে তুলুক। ধুর..."

‎সানা ভীষণ বিরক্ত, সঠিক সময়ে সঠিক কথা মুখ দিয়ে আসছে না। তাই সে হার মেনে, কানে হেডফোনটা তুলে সবার দিকে তাকিয়ে,

‎ -"হোয়াটএভার, ইউ গাইস হ্যান্ডেল ইট। হ্যাঁ"

‎এই বলে সে কউকে কিছু বলতে না দিয়ে 'ডোন্ট কেয়ার' ভাব নিয়ে হেডফোনে চলতে থাকা 'বেদের মেয়ে' গানের তালে তালে হাত পা দুলিয়ে সবার সামনে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় তার গুনগুন শোনা গেল,

‎ -"বেদের মেয়ে জোছনা আমি নাগিন ধরেছি...,

‎ কালো কালো নাগিন আমি ফাঁদে ফেলেছি"

‎ ছয় জোড়া চোখ তার দিকে বিস্মিত বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে, এমন যেন সবাই ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সানাকে তারা ভাবত ভদ্র, সভ্য ও শান্ত একটা মেয়ে। তার এই রুপ, সবার বিষয়টা হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল।

‎ আরজে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের রাগ সংবরণ করে, রওনাকের দিকে তাকিয়ে আদেশ ছুড়লো,

‎ -"তুমি ঈশানীকে নিয়ে যাও, আমি আসছি"

‎এই বলে শেষ সানার রুমের দিকে চলে গেল।

‎__________________

‎রওনাক ঈশানীকে হাত ধরে তোলে। সে এবার সত্যিই ব্যথা পেয়েছে। কালকে আর আজকে মিলিয়ে দুই দুবার সানা তাকে ফেলে দিয়েছে। তার ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে সানার গালে 'ঠাস' করে একটা থাপ্পর দিতে। কিন্তু আরজে সামনে থাকার কারণে সেটা করতে পারেনি। কিন্তু মনে মনে ধীরস্থির করে নিল, সে সানাকে ছাড়বে না। তারা বেরিয়ে পড়ল।

‎_________________

‎আরজে সানার রুমে এসে দেখে, সানা সামনে মোবাইল চালিয়ে মটু পাতলু দেখছে আর নখে নেইল পলিশ দিচ্ছে। ভাব এমন যেন এই মুহূর্তে নিচে কি হয়েছে,সে কি কি কাণ্ডকারখানা করেছে এই সম্পর্কে তার কোন ধ্যান ঘ্যান নেই। সে নিজের নেইল পালিশ নিয়ে ব্যস্ত। আরজে বুঝতে পারছে না, সানা তো এমন ছিল না। এতটা হৃদয়হীন কবে থেকে হলো। সে সানার সামনে দাঁড়িয়ে তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

‎ -"তুমি ঈশানী কে ইচ্ছা করেই ধাক্কা দিয়েছিলে তাইনা?"

‎সানা চোখ তুলে এক পলক তার দিকে তাকালো। তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিজের কাজে বহাল থাকলো,

‎ -"একদম"

‎ -"কেন করেছো তুমি?"

‎ -"মন বলেছে তাই"

‎ আরজে সানার কথার মানে ধরতে পারল না। তাই সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল,

‎ -"মানে?"

‎সানা হাতের নেইল পালিশটা টেবিলে 'ঠাস' করে রাখে। আরজের দিকে বিরক্তিসূচক দৃষ্টিতে তাকায়,

‎ -"আরে কি মানে মানে করছেন? লোকে আাাা.... বললে 'আখাউড়া' বুঝে পেলে। আর আমি বলছি 'মন বলেছে' আর আপনি বুঝতে পারছেন না মন কী বলেছে?

‎________________

‎আরজে তড়িঘড়ি করে শুটিংয়ের জন্য যেতে নেয়। এমন সময় পিছন থেকে মিসেস আয়েশা বলেন,

‎ -"বাবা কিছু না মনে করলে আমি একটা কথা বলি?"

‎ -"জি বলেন"

‎ -"জানো সময় আর মানুষের মধ্যে একটা সাদৃশ্য আছে, দুজনকেই গুরুত্ব না দিলে অতি সহজেই হারিয়ে যায়। সময় কে ঠিক মত কাজে না লাগালে জীবনে সার্থক হওয়া যায় না, তেমনি সঠিক মানুষটাকে আগলে না রাখলে জীবনে আফসোসের শেষ হয় না । আমরা সব সময় তখন সবকিছুর মর্ম বুঝি যখন শত চেষ্টা করেও আর ফিরে পাওয়া সম্ভব হয় না।"

More Chapters