#পর্বসংখ্যা৪
#হ্রদয়ামিলন
#Shavakhan
গত পনেরো মিনিট যাবত সানা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে দাড়িয়ে আছে। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তির চাপ।সানা বুঝতে পারছে না বিমানবন্দরের সামনে দুই তিনটা চেয়ার রাখলে কি এমন হতো, কতই বা খরচ যেত সে যদি দেশের প্রেসিডেন্ট হতো তাহলে সর্বপ্রথম এখানে চেয়ার রাখতো। বিরক্তি নিয়ে আবারও চারপাশ তাকাল, নাহ এখনো বের হয়নি। মনে মনে ভাবছে, ' আসুক আগে, প্রথমে কাচা চিবিয়ে খাব তারপর কথা। সানা খান কে পনেরো মিনিট দাড় করানো,,,,
তার ভাবনার মাঝেই কেউ তাকে পিছন থেকে ডেকে উঠলো,
-"রাক্ষসী রানী কটকটি,"
সানা খুব ভালো করেই জানে তাকে এই নামে কে ডাকতে পারে তাই সে পিছন না ফিরেই বলে,
-"বাবা বিটকেল এখানে আসো তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে "
যখন কেউ আসলো না তখন সানার টনক নড়ল অন্য কাউকে কিছু বলেনি তো।সানা তৎক্ষনাৎ পিছন ফিরে তাকাল।সামনেই নজরে আসলো অতি পরিচিত একটা মুখ। পাচ ফিট এগার ইঞ্চির শুভ্র ফর্সা একখানা মুখ যে এইমুহূর্তে হাসি দিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। পরনে ডেনিম জ্যাকেট সাথে ওয়াইট সুজ,একহাতে সাদা স্যুটকেস অন্য হাত দিয়ে চোখের কালো সানগ্লাস টা খুলে দুই হাত দুই দিকে মেলে শাহরুখ খান স্টাইলে দাঁড়িয়ে সানার দিকে তাকিয়ে আছে। সানা ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গেল। গিয়েই ঠাস করে একটা জোরে কিল বসিয়ে দিল বাহুতে আর বলতে শুরু করল,
-"এসপির বাচ্চা, এটা তোর আসার সময়। গত পনের মিনিটের উপরে আমি এখানে চেয়ার ছাড়া দাঁড়িয়ে,তুই বুঝতে পারছিস"
এসপি খুব ভালো করে জানে সানা এটাই বলবে। তাই সে কিল বসানো জায়গায় নিজের হাত দিয়ে ঢলতে ঢলতে বলল্,
-"সানা মেরি মা, আমি সত্যি বলছি, আমি পাইলট কে একশ বার বলেছি আমাকে পনের মিনিট আগে যেন নামিয়ে দেওয়া হয় কেননা আমার জন্য এয়ারপোর্টে ভিভিভি...আইপি মানুষ অপেক্ষা করছে কিন্তু পাইলট ঠিক আমাকে পনের মিনিট পরেই ল্যান্ড করালো আর তোর পনের মিনিট দাড়িয়ে থাকতে হলো। টাস্ট মি পেস্ট্রি আ'ম ইনোসেন্ট "
এসপি ভোলাভালা চেহারা বানিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সানা খুব ভালো মতন বুঝতে পারল এই ছেলে তার মজা উড়াচ্ছে। সানা মুখে মেকি হাসি নিয়ে শুধালো,
-"মজা নিচ্ছিস"
-"হুম"
-"মজা এসেছে"
-"হুম"
-"কানের নিছে বাজাই এবার?"
-"হুম"
টনক নড়তেই এসপি তড়িঘড়ি করে মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বলে ওঠল,
-"আরে না না। এভাবে ওয়েলকাম মাত্র তোর থেকেই আশা করা যায়"
সানা কথা না বাড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল্,
-"তুই কি যাবি নাকি এখানে থাকবি,থাকার হলে থাক শুধু স্যুটকেসটা আমায় দিয়ে দেয়"
এসপি পিছু পিছু এসে বলল,
-"আরে দাঁড়া, এখনো গাড়ি আসে নাই"
সানা হাটা থামিয়ে তার দিকে ফিরে বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
-"গাড়ি! কীসের গাড়ি?"
সানার বলতে দেরি কিন্তু তাদের সামনে একটা গাড় লাল রঙের টয়োটা ল্যান্ড ত্রুুজার এসে দাড়াতে দেরি হয়নি। ভেতর থেকে ডাইভার বেরিয়ে চাবি আর ডাইভিং লাইসেন্স এসপির হাতে ধরিয়ে চলে গেল। এসপি হাতে চাবি নিয়ে সানার দিকে ফিরে একটা হাসি দিয়ে বলল,
"দেটস্ মাই নিউ কার"
সানা বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
-"এসপি... তুই বিদেশে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ব্যাংক ডাকাতি করিসনি তো"
ব্যাস এসপির মুখ চুপসে গেল। সে অসহায় কণ্ঠে বলল,
-"এটা আমার ভাই কিনে দিয়েছে"
সানার এবার সন্দেহ দূর হলো, সে উচ্ছ্বসিত হয়ে জানান দিল,
-"তহলে ঠিক আছে। আমি আবার ভাবলাম তোর মতো ফকিরের কাছে এত দামি গাড়ি কোথা থেকে আসল।"
-"আমি ফকির!"
-"তুই কি নিজেকে আমির দাবি করতে চাস"
এসপি কথা বাড়ালো না। এই মেয়ের সাথে কথা বাড়ালে তার সম্মান যতটুকু আছে অতটুকু ও চলে যাবে। সে গাড়ির পেছনের সিটে স্যুটকেসটা রেখে দুজনে সামনে বসল। গাড়ি চলে গেল এয়ারপোর্টের সীমানার বাহিরে।
এসপি মানে 'সারফারাদ চৌধুরী' সানার একমাত্র বেস্ট ফেন্ড। বলা বাহুল্য চাইল্ডহোড ফেন্ড কারণ তারা দুজনে একসাথে ক্লাস থ্রি থেকে অনার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। এসপির দাদা ছিল ঐসময়কার অনেক বড় রাজনৈতিক নেতা।তখন তাদের পারিবারিক অবস্থা ছিল জমজমাট। কিন্তু বেশিদিন সুখ সহ্য হয়নি। পলিটিক্যাল আপ ডাউনের জন্য তাদের পরিবারকে মুখোমুখি হতে হয় বড় ধরনের দূর্বিষহের। যার জন্য তাদের পরিবারের সবার জীবন ঝুঁকিতে চলে আসে। এসপির বড় ভাইকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাহিরের দেশে।এসপি ছোট থাকার কারণে তাকে তার মামার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সানাদের বাড়ির পাশেই এসপির নানার বাড়ি সেখান থেকেই তাদের পরিচয়। যদিও এসপি সানার থেকে দুই বছরের বড় কিন্তু তাদের বন্ডিং অনেক ভালো। রাজনৈতিক শত্রুরা তার বাবা আর দাদার এক্সিডেন্ট করায়। ঐ এক্সিডেন্টে তার বাপ দাদা দুজনেই মারা যায়, তাদের ব্যবসার হাল ধরে এসপির মা রাহেলা চৌধুরী। তিনি একজন শিক্ষিত ও বিচরণক্ষন মহিলা ছিলেন। ভদ্রমহিলা একা নিজের নিজের কোম্পানি দাঁড় করান যার নাম 'গিনি ফ্যাশন হাউজ'। এটি এখন অনেক বড় একটি পোশাক কারখানা ও ফ্যাশন হাউজে পরিনত হয়েছে। এসপির বড় ভাই সারহাদ চৌধুরী এখন একজন ফেমাস ডিরেক্টর সাথে তার মায়ের কোম্পানিও দেখাশোনা করে। দেড় বছর আগে এসপির নানি মারা গেলে এসপির মামা এসপিকে নিয়ে বাহিরের দেশে যায়।অন্যদিকে, এসপির প্রধান কাজ হলো মেয়ে পটানো। মেয়েরা পটার আগ পর্যন্ত তা চেষ্টার অবকাশ থাকবে না।একবার পটে গেলেই ব্রেকআপ। তারা দুজনেই স্কুল থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত ভণ্ডামির জন্য ফাস্ট ক্লাস পেত।
____________
শুটিং চলছে আর জের 'ইনফিনিটি লাভ' মুভির। মুভির শুট প্রায় শেষের দিকে। লাস্টের কয়েকটা সিন ডুবাই শুট করা হবে। আর জে এইসব নিয়ে ডিরেক্টরের সাথে কথা বলছিল। সামনের সেটে সবাই সবকিছু রেডি করছে। একটু পর তার আর ঈশানীর কিসিং সিন। সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর ঈশানী আসল একদম তৈরি হয়ে।চোখে মুখে উপচে পড়া খুশি।কিন্তু মুহূর্তে তার মুখ কালো হয়ে গেল, যখন আরজের পরিবর্তে তার বডি ডাবল কে দেখল। আরজে অ্যাকশন সিন থেকে শুরু করে সকল সিন সে নিজে করে,একমাত্র রোমান্টিক সিন করার জন্য তার বডি ডাবল রাখা হয়।ঈশানী হতাশ হয়ে তার কাজে মন দিল। অদূরে আরজে ডিরেক্টরের সাথে বসে। মনে মনে চলচে সানার আজকের করা বিহেভ।সব তো ঠিক ছিল হঠাৎ কী হলো সানার। সিন শেষে আরজের ম্যানেজার রওনাক এসে জানায় ডুবাই শুটিং শেষে তার একটি কনসার্টের আয়োজন করা হবে যদি আরজে হ্যা বলে। আরজে কিছু ভেবে হ্যা বলে দেয়।
________________
এসপির টয়োটা গাড়িটা রাজধানীর সেই চিরচেনা জ্যামে ফেঁসে আছে। এসপি খুব বিরক্ত এই ট্রাপিকের জন্য এদেশের রাস্তা ভালো লাগে না।ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে লন্ডনের রাস্তাটা নিয়ে আসতে।পাশে তাকিয়ে দেখল সানা চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে আছে। ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। এসপির মায়া হলো।সানা কোনদিন ও এমন ছিল না। লাইফ সম্পর্কে ছিল পুরো উদাসীন। অথচ বিয়ের পরে প্রায় তার কাছে কল দিয়ে কান্নাকাটি করত। এসপি কল্পনাও করেনি সানা এমন হবে। সানা চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
-"এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?"
-"ভাবছি তোর উপর আমার রাগ করা উচিত "
সানা চোখ মেলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
-"কেন?"
-"মা চলে যাওয়ার ব্যপারে আমাকে সাথে সাথে জানালি না কেন? মা ছোট থেকে আমাকে নিজের ছেলের থেকেও বেশি আদর করত।আর আমি শেষবার তাকে দেখতেও পারলাম না"
এসপি ছোটবেলা থেকে সানার দেখাদেখি সেও সানার মাকে মা বলে ডাকে,সানা স্থির কণ্ঠে বলল,
-"ঐসময় আমার ব্রেইন ব্রেইনিং করে নাই"
-"কীহহ! ব্রেইনিং! মানে"
সানা একটু জোরে বুঝাল,
-"ওয়ার্কিং,,,,, ওয়ার্কিং করে নাই"
-"এইটা বল তোর আবেগ কাজ করছিল বিবেক কাজ করে নাই।আচ্ছা এগুলো ছাড় মামা, তোর আপডেট বল"
-"ঐ আরজে কে আমি ডিবোর্স দেব,কিন্তু তার আগে বুঝাব সানা কে"
এসপি দুষ্টমির সুরে বলে,
-"তুই কি ঐ নাগিন সিরিয়ালের মতো প্রতিশোধ নিবি"
এসপি দুষ্টুমি করে বললেও সানা সিরিয়াস হয়ে জানাল,
-"উহু, খেলাটা প্রতিশোধের থেকেও বেশি অবহেলার, কেননা রানভীর বা তার ফেমিলি এই একবছরে আমার উপর কোন নির্যাতন বা অত্যাচার করেনি,তবে অবহেলিত হয়েছি অবশ্যই ।তাই রানভীর কে বুঝাব কারো অবজ্ঞা নিয়ে বেছে থাকা কতটা কঠিন"
সানার চোখে খেলে দৃঢ় সংকল্প।এসপি কিছু একটা ভেবে আবার জিজ্ঞেস করল,
-"ভালোবেসেছিস ওকে?"
সানা কিছুক্ষণ থেমে জবাব দিল'
-"না"
এসপি তড়াক করে তার দিকে তাকাল,
-"তাহলে এই একবছর কেন?"
-"কথা দিয়েছিলাম আমি আমার মাকে। মা লাইফে ফাস্ট টাইম কিছু চেয়েছিল আমার কাছে, আমি যেন মন প্রাণ দিয়ে সংসার করি। আর মা সকাল বিকাল করে একটা কথাই বলতো, মেয়েদের জীবন মানেই স্বামী আর সংসার। পরে আমি ভাবলাম বিয়ে যখন হয়েই গিয়েছে হয়ত এটাই ভাগ্য। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি"
এসপি ধীর কণ্ঠে শুধালো,
-"কী বুঝতে পারছিস?"
-"যে থাকতে চায় না তাকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। মাঝখান দিয়ে আমার স্বপ্ন গুলো গেলো। বিয়ে না হলে এতদিনে আমি কতবড় ডিজাইনার হয়ে যেতাম।"
সানা উপরের দিকে তাকিয়ে উদাসীনভাবে ভাবতে ভাবতে বলল,
-"দেশ বিদেশ থেকে লোকজন আসত শুধু একপলক আমাকে দেখার জন্য।"
সানা স্বপ্নে ডুবে গেল। এসপি বুঝতে পেড়ে তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে তাকে নাড়া দিল,
-"এ..এ..এ স্বপ্নেররানী স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আয়।..... কারণ পেস্ট্রি তোর স্বপ্ন আর এই ট্রাফিক এখনো একই জায়গায় ফেঁসে আছে। ইয়ার তাহলে তোর এখনো স্বপ্ন ডিজাইনার হওয়াই?"
সানা ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
-"হ্যা, সাথে আরেকটা আছে"
এসপি উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে,
-"কী সেটা?"
সানা শয়তানি হাসি দিয়ে জানাল,
-"একদিন আমি বড়লোক হব। অনেক টাকা হবে আমার, তারপর চারটা গরু কিনব আমি"
-"পেস্ট্রি তুই গরু কিনবি কেন?"
-"কেননা আমি পুরো শহর বাসীকে জানিয়ে ঐ রানভীরের আকিকা দেব আবার। ওর নাম আমি 'রানভীর জাওয়ান' এর পরিবর্তে 'রানভীর জাওরা' রাখব।"
এসপির পেট ফেটে হাসি এলো, সে হাসি থামিয়ে বলল,
-"সাথে আর একজনের ও রাখিস?"
সানা জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে এসপির দিকে তাকিয়ে
-"কার?"
এসপি দুঃখের সহিত অসহায় কণ্ঠে বলল,
-"আবে ইয়ার তুই তো জানিস তোর লাইফে একটা জাওরা জামাই আছে, আর আমার লাইফে একটা জাওরা মামাই আছে।"
এবার দুজনেই একসাথে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তাদের দুজনের বন্ডিংটাই এমন। না দুজনের মাঝে কোন গোপনীয়তা আর না কোন জড়তা। হাসি থামিয়ে এসপি জিজ্ঞেস করল,
-"এখন কোথায় যাবি?"
-"জিও ফ্যাশন একাডেমিতে চল"
ততক্ষণে ট্রাফিক ছেড়ে দিয়েছে।এসপি হাসি বজায় রেখেই বলে ওঠে,
-"তাহলে আমাদের সানা ফিরে এসেছে"
-"ইয়াহ সানা ইজ বেক"
এসপি ফুল স্পিডে গাড়ী চালিয়ে বলল,
-"So let's go Pesty"
-"Ok Besty"
________
